face
   

চিড়ধরা ভেঙে ফেলা

চিড়ধরা  ভেঙে ফেলা

চিড়ধরা ভেঙে ফেলা

একটু বিশ্রামের পর দু’বন্ধু আবার তাদের আসনে পূর্ণ উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে বসল। মাইকেল কথা শুরু করলঃ

আমরা লক্ষ্য করলে দেখি সাধারণভাবে ইসলামী সমাজে তালাক ব্যাপক হারে প্রচলিত আছে, ইসলাম এটাকে বৈধতা দেয়ার কারনে এ সব তালাক হয়ে থাকে।

রাশেদঃ প্রথমতঃ ইসলামই সর্বপ্রথম তালাক প্রথা চালু করেনি, যাতে এর যাবতীয় দায়-দায়িত্ব ইসলামের উপর বর্তাবে। ইসলামের পূর্বে এ পৃথিবীতে তালাক প্রথা ব্যাপকহারে চালু ছিল। পুরুষ রাগ হলেই ন্যায়-অন্যায় বিচার না করে নারীকে বিতাড়িত করে দিত, এতে নারীর কোন অধিকার বা ক্ষতিপূরণ ছিলনা।

যখন গ্রিক সভ্যতা উন্নীত হল তখনো সেখানে কোন নিয়ম-কানুন ও শর্ত ছাড়াই তালাক প্রথা ব্যাপক হারে চালু ছিল। আর ইহুদী ধর্মে তালাক জায়েযএবং এটা শুধুমাত্র পুরুষের অধিকার ও ইচ্ছায় হয়। এমনকি সে কোন কারন ছাড়াই স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে, যদিও তারা মনে করেন যে, কারন বশতঃ তালাক দেয়া উত্তম। তালাকের ক্ষেত্রে তাদের মধ আরেকটা জিনিস লক্ষ্য করা যায়, তা হলোঃ কোন নারীর তালাক হলে সে তার প্রথম স্বামীর কাছে আর আসতে পারবেনা।

দ্বিতীয়তঃ আসলেই কি তালাক ইসলামী সমাজে ব্যাপক হারে প্রচলিত যাতে আমরা বলতে পারি ইসলাম তালাকের অনুমতি দেয়ার কারনে এসব হচ্ছে? বিশ্বের কিছু পরিসংখ্যানের তুলনা করলে এটা আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে।

১৯৯২ ও ১৯৯৫ সালের হিসেব মতে, আমেরিকাতে গড়ে প্রত্যেক (১০০০) বিবাহের মাঝে বছরে তালাকের পরিমান (৫০২) জন, এর প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ কারনেই আমেরিকার কর্তৃপক্ষ তালাকের পরিমানের হার প্রকাশ করেনা, যদিও তারা ১৯৯৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিবাহের পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে।

রাশিয়াতে ২০০১ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত গড় প্রতি (১০০০) বিবাহের মধ্যে (৭৫০) টির তালাক হয়েছে।

সুইডেনে গড় প্রতি (১০০০) বিবাহের মধ্যে (৫৩৯) টির তালাক হয়।

২০০০-২০০৩ সালের পরিসংখ্যান মতে, বৃটেনে গড় প্রতি (১০০০) বিবাহের মধ্যে (৫৩৮) টির তালাক হয়।

২০০০-২০০৩ সালের পরিসংখ্যান মতে, জাপানে গড় প্রতি (১০০০) বিবাহের মধ্যে (৩৬৬) টির তালাক হয়।

এবার যদি আমরা ইসলামী সমাজে দেখি তবে দেখব সবচেয়ে বেশি তালাক হয় কুয়েতে, যা ২০০০-২০০৪ সালের পরিসংখ্যান মতে, কুয়েতে গড় প্রতি (১০০০) বিবাহের মধ্যে (৩৪৭) টির তালাক হয়েছে।

আর অন্যান্য মুসলিম দেশে এর পরিমান অনেক কম। যেমনঃ জর্দানে ২০০০-২০০৪ সালের পরিসংখ্যান মতে, গড় প্রতি (১০০০) বিবাহের মধ্যে (১৮৪) টির তালাক হয়েছে।

ফিলিস্তিনে গড় প্রতি (১০০০) বিবাহের মধ্যে (১৪২) টির তালাক হয়েছে।

মিশরে, ২০০০-২০০৩ সালের পরিসংখ্যান মতে, গড় প্রতি (১০০০) বিবাহের মধ্যে (১৩৪) টির তালাক হয়েছে।

সিরিয়ায়, ২০০০-২০০২ সালের পরিসংখ্যান মতে, গড় প্রতি (১০০০) বিবাহের মধ্যে (৮৪) টির তালাক হয়েছে।

লিবিয়ায়ে, ২০০০-২০০৪ সালের পরিসংখ্যান মতে, গড় প্রতি (১০০০) বিবাহের মধ্যে (৫১) টির তালাক হয়েছে।

ইরানে, ২০০২-২০০৩ সালের পরিসংখ্যান মতে, গড় প্রতি (১০০০) বিবাহের মধ্যে (৯৭) টির তালাক হয়েছে।

তাহলে কি এখনো বলবা যে, তালাক ইসলামী সমাজে ব্যাপকহারে প্রচলিত? আর এর কারন হলো ইসলাম তালাকের বৈধতা দিয়েছে?!

মাইকেলঃকিন্তু এটাতো ঠিক যে, অন্যান্য ধর্ম ও রীতির তুলনায় ইসলাম খুব সহজে তালাক দেয়ার অনুমতি দিয়েছে।

রাশেদঃ তোমার এ মন্তব্য বিশ্লেষণে অনেক কথার প্রয়োজন আছে, আমাকে যদি অনুমতি দাও তবে বলতে পারি।

মাইকেলঃশুরু কর।

রাশেদঃ প্রথম বিষয়ঃ ইসলাম খুব সহজে তালাকের অনুমতি দিয়েছে এ বিশ্বাসের ব্যাপারে বলছি, আসমানী কোন আইন বা সামাজিক কোন আইনই তালাককে উৎসাহিত করেনা... তোমার সাথে আমি স্বীকার করব যে, কিছু কিছু লোক এ ব্যাপারটাকে সহজ সরল মনে করে অলসতা করে, যারা ইসলামের শিক্ষাকে বাস্তবায়ন না করে এর অপব্যবহার করে থাকে। এর সাথে সাথে আমাদেরকে একথা অকপটে স্বীকার করতে হবে যে, ইসলাম এ ধরনের অপবাদ থেকে সম্পুর্ণ মুক্ত। ইসলাম তালাকের ব্যাপারে একটা সীমা নির্ধারন করে দিয়েছে, কতিপয় নিয়ম নীতি প্রনয়ণ করেছে যাতে এর খারাপ প্রভাব কম হয়। সমাজে যা হচ্ছে তা ইসলামের সঠিক রীতি-নীতি পালন না করার কারনে।

মাইকেলঃ তুমি কি অরেকটু বিশ্লেষণ করে বলবে?

রাশেদঃ ইসলামে বিবাহ হল চিরস্থায়ী বন্ধন, কোন সময়ের সাথে নির্দিষ্ট করা হারাম। এর অর্থ হলঃ স্বামী-স্ত্রীর বৈবাহিক জীবন মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত চলতে থাকবে। বিবাহ বন্ধনকে কঠিন অঙ্গিকার বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এতে রয়েছে সম্মানবোধ ও বিচ্ছেদের ভাবনা থেকে বিরত থাকার গ্যরারান্টি। এ ছাড়া ইসলামে তালাক জঘন্যতম একটা হালাল কাজ যা খুব প্রয়োজনের সময় বৈধ বলা হয়েছে। যখন নিরুপায় হয়ে যাবে, তখন ইসলাম নির্দেশ দেয় দেয়, পরস্পর ইসলাহ ও সমঝোতার সর্বাত্তক চেষ্টা করা, উভয় পক্ষ থেকে লোক নিয়োগ করে চেষ্টা অব্যহত রাখা, উভয়ের মাঝে প্রীতি ও সম্মান বজায় রেখে পারিবারিক সম্পর্ক টিকে রাখার সব ধরনের ব্যবস্থা করা।

ইসলাম স্ত্রীকে তালাক না দিয়ে রেখে দিতে বলেছে, যদি তার স্বামী তার কোন দোষের কারনে অপছন্দ করে, তাহলে তাকে তার অনেক ভাল ভাল গুনের দিকে লক্ষ্য করতে নির্দেশ দিয়েছে, যার কারনে সে তাকে তালাক না দিয়ে বিবাহ টিকিয়ে রাখতে পারে, এতে বৈবাহিক জীবনের পবিত্র সম্পর্ক রক্ষা হবে। হাসি-তামাশাচ্ছলে তালাকের শব্দ ব্যাবহার করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। এমনিভাবে স্ত্রীর সাথে স্বামীকে তার মন মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করে চলতে আদেশ দিয়েছে।

স্বামী- স্ত্রী যখন দু’পক্ষের সমঝোতায় সর্বাত্তক চেষ্টার পরেও তাদের সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারবেনা তখন তালাককে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করতে আদেশ করেছে, যাতে আবার তারা বৈবাহিক জীবনে ফিরে যেতে পারে। একসাথেই বৈবাহিক জীবনের অবসান করিনি, বরং তিন বার করে তালাকের ব্যবস্থা রেখেছে। স্বামী প্রত্যেকবার তালাকের পরে আবার তার স্ত্রীকে ফিরে আনতে সক্ষম , এমনকি তৃতীয়বারও ফিরে আনার ব্যবস্থা আছে, তবে সে ক্ষেত্রে তাকে অন্য স্বামীর সাথে বিবাহ হতে হবে ও সে তালাক দিলে উক্ত স্ত্রী প্রথম স্বামীর কাছে আসতে পারবে।

মাইকেলঃ এটা প্রথম বিষয়, এর পরেরটা কি?

রাশেদঃ অন্য বিষয়টি হলো যে, তালাকের ব্যাপারে অমুসলিম সমাজে মানুষের মারাত্মক ভুল চিন্তা-ভাবনা। সেখানে সামান্য কারনেই তালাক হতে পারে, যা তুমি জান। যেমনঃ আমেরিকাতে বিচারকার্য ঘটনা বিবরণীতে দেখা গেছে যে, স্ত্রীর কম্পিউটারের আসক্তি, কোন প্রোগ্রাম বা টেলিভিশনে খেলা দেখা ইত্যাদি সামান্য কারনে তালাক হয়ে থাকে। কানাডায় ঘুমের মধ্যে নাক ডাকলে তাৎক্ষনিক তালাক দিয়ে দেয়। ইটালিতে যখন কেউ গৃহের কাজে কাউকে বাধ্য করে তখন তালাক দিয়ে দেয়। বৃটেনে স্বামীর ব্যাপারে একটু অবহেলা ঘটলে- যেমন স্বামীর কোন স্মারক বস্তু হারিয়ে ফেললে- বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে।

আর জাপানে কোর্ট এমন রায় দিয়েছে যে, যদি একজনের ঘুমের ধরন অন্যজনের পছন্দ না হয় তবে তালাক চাইতে পারবে।

মাইকেলঃতুমি যা উল্লেখ করেছে তা সবই ঠিক। কিন্ত এসব হলো দ্বীন থেকে দূরে সরে যাওয়া ধর্মহীন সমাজের বাস্তব অবস্থা। কিন্তু খৃষ্টান ধর্মে তালাকের ক্ষেত্রে এমন কিছু শর্তাবলী আরোপ করা হয়েছে যা প্রমাণ করাও দুরুহ ব্যাপার, আর এসব শর্ত ব্যতিত তালাককে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।

রাশেদঃ আমি মনে করি এ কঠোরতা মানুষের প্রকৃতির বিরোধীএবং এটা মানুষের জীবনের সাথে উপযোগীও নয়। তোমার কাছে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠবে যখন দেখবে, যেসব খৃষ্টানলোক ইসলামী দেশে বসবাস করে তারা দু’টো ধর্মের পার্থক্যটা ভালকরে বুঝতে পেরে তাদের কেউ কেউ ধর্ম পর্যন্ত ত্যাগ করেছে; শুধু এ কারনে যে, যখন তারা দেখেছে সামাজিক জীবনে তারা বিচ্ছেদ হতে পারছেনা, আবার এর কোন সমাধানও তারা তাদের ধর্মে খুঁজে পাচ্ছেনা।

এটাই ইসলামের বৈশিষ্ট্য। ইসলাম বিবাহের বন্ধনকে চিরস্থায়ীভাবে আবদ্ধ করে, কেননা ইহা এ পৃথিবীতে বসবাসকারী মানুষের জীবন বিধান। যাদের রয়েছে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য, মানবিক গুনাবলী, পারিপার্শ্বিক অবস্থা যা পরিবর্তনশীল। এছাড়াও স্বামী-স্ত্রী নির্বাচনে কখনো কখনো ভুলও হয়ে থাকে, কেননা এটা বাস্তব অভিজ্ঞতা ছাড়া জানা যায়না। এ সব পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও ঘটনার পরিবর্তনের দিকে লক্ষ্য রেখেছে যাতে এসব ভুলের কারনে বড় ধরনের ভুল না হয়, যা কখনো কখনো সামাজিক , মানসিক ও শারীরিক মারক ক্ষতির কারন হয়ে দাঁড়ায়।এজন্য যখন এ সব সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হবে, সব সমাধানের পথ অবরুদ্ধ হয়ে যাবে, ইসলাম তখন তালাকের বিধানের প্রবর্তন করেছে। এতে প্রমাণিত যে, ইসলাম বাস্তবধর্মী ধর্ম, নারী পুরুষসহ পরিবারের সকলের প্রতি ন্যায় বিচার করেছে। পরিবারের সব সদস্যদেরকে মতপার্থক্য এবং অনৈক্যের আগুনে না জ্বালিয়ে উত্তম হলো এ সম্পর্ককে ইতি টেনে নতুন করে জীবন শুরু করাই ভালো, যেখানে বিবাহের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বিদ্যমান থাকবে, আর তা হলোঃ ভালবাসা ও রহমতের মাধ্যমে মানসিক প্রশান্তি লাভ করা, আর এভাবে একটি সুন্দর পরিবার গঠন করা। তাই ইসলামে তালাক হলো একটি চিকিৎসা, সুষ্ঠ পদ্ধতি, পরিবর্তনের সুযোগ, একটি সফল সুন্দর জীবন গঠনের সুযোগ করে দেয়া।

আমি মনে করি,ইসলাম যে উপরে বর্ণিত নিয়ম-কানুনের ভিত্তিতে তালাকের বিধান প্রবর্তন করেছে, তা ইসলামের উদারতা ও বাস্তবমুখী হওয়ার প্রমাণ।

মাইকেলঃ কিন্তু, ইসলাম তালাককে কেন শুধু পুরুষের অধিকার করেছে? এতে কি নারীর উপর জুলুম করা হয়নি?

রাশেদঃ আমি আবারো বলছি, আমাদেরকে এ বিষয়টা নিয়ে সর্বদিক বিবেচনা করে গভীরভাবে ভাবতে হবে।অর্থাৎ পূর্নাঙ্গ সামাজিক প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে ভাবতে হবে।

প্রথমতঃ বিবাহ, এর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, এরপর পরিবারের অর্থ, এর মাঝে সব সদস্যদেরভূমিকা, সদস্যদের দায়িত্ব-কর্তব্য ও অধিকার ইত্যাদির দিকে নিজর দিতে হবে।

এখানে এটাও উল্লেখ্য যে, বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত যে, নারীরা পুরুষের চেয়ে অনেক বেশী আবেগপ্রণ ও অধিক দ্রুত উত্তেজিত ও পরিবর্তিত হয়ে পড়ে। পক্ষান্তরে পুরুষেরা অনেকটা সচেতন ও পরিনাম বিশ্লেষনে বেশি সাবধান, নিজেদের মেজাজ, রাগ ও আবেগ, উত্তেজনা ইত্যাদি দমনে বেশি সক্ষম।

এছাড়া ইসলামে তালাকের কারনে পুরুষেরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়, যেহেতু তালাকের পর তার ভরন পোষণ ও মোহরের দায়-দায়িত্ব পুরুষের উপর থাকে। এ কথা দ্বিধাহীনভাবে বলা যায় যে, পুরুষের এসব অতিরিক্ত দায়-দায়িত্বের কারনে সে নিজেকে অনেকটা নিয়ন্ত্রণে রাখবে, যাতে তালাক না হয়।

এতদসত্বেও ইসলাম তালাককে শুধু পুরুষের অধিকারের মাঝে সীমাবদ্ধ করেনি, বরং নারীর জন্যও বিবাহ বিচ্ছেদের পথ খুলে রেখেছে; যখন সে এর উপযোগী কারণ দেখবে। এটাই হচ্ছে ‘খুলা’, যা সম্পন্ন হবে সকলের অধিকার সংরক্ষনকারী শরিয়তের কতিপয় বিধি-বিধান ও নিয়ম-কানুনের ভিত্তিতে।

বন্ধু, তোমাদের দেশের নারীদের অবস্থা সম্পর্কে কি কিছু আলোচনা করব?!

মাইকেলঃ আমার মনে হয় দুপুরের খাবার খাওয়া উচিত।

  - শান্তির সংলাপ
  - উপন্যাস সম্পর্কিত
  - বই সম্পর্কিত
  - ভিডিও সম্পর্কিত
সরল বিশ্বাস