face
   

ইজ্জত ও সম্মানের পথঃ

ইজ্জত ও সম্মানের পথঃ

ইজ্জত ও সম্মানের পথ

মানুষের জন্য আল্লাহ কর্তৃক সম্মানের ধরণসমূহ

আল্লাহ তায়া’লা বনী আদমকে সৃষ্টি করে ফেরেশতাদেরকে তাঁকে সিজদা করতে আদেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তায়া’লা বলেনঃ আর আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, এরপর আকার-অবয়ব, তৈরী করেছি। অতঃপর আমি ফেরেশতাদেরকে বলছি-আদমকে সেজদা কর তখন সবাই সেজদা করেছে, কিন্তু ইবলীস সে সেজদাকারীদের অন্তর্ভূক্ত ছিল না। (সূরা আ’রাফঃ ১১)

তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, শুরু থেকেই তাকে অন্যান্য অনেক মাখলুকাতের উপর সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছেন। আল্লাহ তায়া’লা বলেনঃ নিশ্চয় আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি, আমি তাদেরকে স্থলে ও জলে চলাচলের বাহন দান করেছি; তাদেরকে উত্তম জীবনোপকরণ প্রদান করেছি এবং তাদেরকে অনেক সৃষ্ট বস্তুর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি। (সূরা বনী ইসরাঈলঃ ৭০)

মানুষ শুরু থেকেই সম্মানিত সৃষ্টজীব, তাদেরকে প্রতিপালক নিম্নোক্ত বিষয়ে সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছেনঃ

1.কাঠামোগতভাবে সম্মান ও মর্যাদাদানঃ আল্লাহ তায়া’লা বলেনঃ আমি সৃষ্টি করেছি মানুষকে সুন্দরতর অবয়বে। (সূরা ত্বীনঃ ৪)

তিনি তাদেরকে উত্তম অবয়বে সৃষ্টি করেছেন, যেমনঃ সুঠাম শরীর, প্রত্যেক অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মাঝে সুবিন্যস্ততা। জ্ঞান ও চিন্তাশক্তি দান, কথা বলা ও শুনার শক্তি দান, তাদেরকে সবচেয়ে সুন্দর আকৃতি ও অবয়বে সৃষ্টি করেছেন।

2.জলে ও স্থলে সব কিছু মানুষের অধীনস্থ করে সম্মান ও মর্যাদা দেয়াঃ এ অধীনস্থের মধ্যে আবহাওয়া ও পরিবেশও অন্তর্ভূক্ত, কেননা ইহাকে অধীনস্থ করা সম্মানের গুরুত্ব বুঝায়। কেননা আল্লাহ তায়া’লা মানুষের জন্য সব কিছু অধীনস্থ করে দিয়েছেন। তার সমস্ত সৃষ্টির মাঝে তাদেরকে বৈশিষ্ট্যময় করেছেন। এ দ্বারা বুঝা যায় যে, মানুষ এ পৃথিবীর রাজা, যার অনুসরণ ও আনুগত্য করতে হয়, অন্য সব কিছু তাদের প্রজা, তাদের অধীনস্থ। আল্লাহ তায়া’লা বলেনঃ নিশ্চয় আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি, আমি তাদেরকে স্থলে ও জলে চলাচলের বাহন দান করেছি। (সূরা বনী ইসরাঈলঃ ৭০)

বরং আল্লাহ তায়া’লা বলেছেন, আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সবই তিনি মানুষের অধীনস্থ করে দিয়েছেন। আল্লাহ তায়া’লা বলেনঃ এবং আয়ত্ত্বাধীন করে দিয়েছেন তোমাদের, যা আছে নভোমন্ডলে ও যা আছে ভূমন্ডলে; তাঁর পক্ষ থেকে। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে। (সূরা জাসিয়াঃ ১৩)

3.হালাল রিজিকঃ আল্লাহ তায়া’লা মানুষকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তারা যা খুশী তাই খাবে, তিনি খাদ্যের মাঝে উপকার ও ক্ষতির আলামতসমূহ বর্ণনা করে দিয়েছেন। অন্যান্য প্রাণী যা খায়, মানুষ তার চেয়ে অনেক বেশী ধরণের খাদ্য গ্রহণ করে। কেননা অন্যান্য প্রাণী বিশেষ ধরণের খাদ্য খেয়ে থাকে, যাতে তারা অভ্যস্থ। এমনিভাবে আল্লাহ তায়া’লা তার করুনা ও দয়ায় মানুষের জন্য সব কিছু অধীন করে দিয়ে তাদেরকে সম্মানিত করেছেন। আল্লাহ তায়া’লা বলেনঃ যে পবিত্রসত্তা তোমাদের জন্য ভূমিকে বিছানা এবং আকাশকে ছাদ স্বরূপ স্থাপন করে দিয়েছেন, আর আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে তোমাদের জন্য ফল-ফসল উৎপাদন করেছেন তোমাদের খাদ্য হিসাবে। অতএব,আল্লাহর সাথে তোমরা অন্য কাকেও সমকক্ষ করো না। বস্তুতঃ এসব তোমরা জান। (সূরা বাকারাঃ ২২)

4.অন্যান্য মাখলুকাতের উপর শ্রেষ্ঠত্বদানঃ এ পথেই মানুষ তার সম্মান, ইজ্জত, মর্যাদা ও বড়ত্ব বুঝতে পারবে, আল্লাহ তায়া’লা তাদেরকে যে সম্মান দিয়েছেন। অতএব, মানুষ এ পার্থিব জগতে শুধুমাত্র একটি ক্ষুদ্র কণা নয়... তুচ্ছ একটি ক্ষুদ্র কণা যা এ পৃথিবীর সাথে তুলনা করলে সে নিজে একটি ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ কণাই দেখবে। একটিমাত্র পরমানু বোমাই দুই লক্ষকে শেষ করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট, যেমনি ঘটেছে জাপানের হিরোশিমায়। অতএব, ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের আকার নির্ধারিত হয় আল্লাহ প্রদত্ত্ব সে মর্যাদার দ্বারা যা তিনি তাদেরকে দান করেছেন। যখন আমরা দেখব, কোরআনে মানুষ সৃষ্টি ও আদম (আঃ) কে সিজদা দেয়া, অতঃপর ইবলিসকে বিতাড়িত করা, কেননা সে সিজদা করতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন আমরা বুঝতে পারব যে, মানুষকে বিশ্বব্যাপী মর্যাদাবান করে সৃষ্টি করার ভিত্তি কতটাই মজবুত ছিল। এমতাবস্থায় মানুষ আল্লাহর দেয়া পথ ব্যাতীত তার সংকীর্ণতা থেকে বেড়িয়ে আসতে পারেনা। যেহেতু আল্লাহ তাকে ইচ্ছা শক্তি দান করেছেন।আর সে পথ হলো কোরানের পথ। এ পথেই মানুষকে স্বাধীনতা, সম্মান ও সব ধরণের ইচ্ছার অধিকার দান করা হয়েছে।

তাইতো, সম্মান ও ইজ্জতের পথের মানুষকে অপমান, অমর্যাদা ও উপহাস করা জায়েজ নয়। আল্লাহ তায়া’লা বলেনঃ মুমিনগণ, কেউ যেন অপর কাউকে উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং কোন নারী অপর নারীকেও যেন উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারিণী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হতে পারে। তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করো না এবং একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না। কেউ বিশ্বাস স্থাপন করলে তাদের মন্দ নামে ডাকা গোনাহ। যারা এহেন কাজ থেকে তওবা না করে তারাই যালেম। (সূরা হুজরাতঃ ১১)

খোদাভীতি ছাড়া কালোর উপর সাদার, হলদের উপর লালের, অনারবের উপর আববের, এক গোত্রের উপর অন্য গোত্রের, এক উপজাতির উপর অন্য উপজাতির, এক অঞ্চলের উপর অন্য অঞ্চলের বা দরিদ্র লোকের উপর ধনীদের কোন শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা নেই। আল্লাহ তায়া’লা বলেনঃ হে মানব, আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিতি হও। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত যে সর্বাধিক পরহেযগার। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছুর খবর রাখেন। (সূরা হুজরাতঃ ১৩)

মানুষের ইজ্জত ও সম্মানের মানদণ্ড

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ “আল্লাহ তায়া’লা তোমাদের আকৃতি ও ধন সম্পদের দিকে তাকান না, তিনি তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকেই তাকান”। (অর্থাৎ অন্তর ও আমলের ভিত্তিতেই বিবেচনা করেন) (মুসলিম শরিফ)।

এজন্যই মানুষের সম্মান, মর্যাদা এ পথের অনুসরণ ও আকড়ে ধরার মাধ্যমেই অর্জিত হয়। আল্লাহ তায়া’লা বলেনঃ কেউ সম্মান চাইলে জেনে রাখুন, সমস্ত সম্মান আল্লাহরই জন্যে। (সূরা ফাতিরঃ ১০)

অন্যদিকে তার অপমান ও লাঞ্ছনা এ পথ থেকে দূরে থাকার কারণেই, যে পথে সমস্ত মাখলুকাত আল্লাহর আনুগত্যের উপর ঐক্যমত হয়েছে। আল্লাহ তায়া’লা বলেছেনঃ তুমি কি দেখনি যে, আল্লাহকে সেজদা করে যা কিছু আছে নভোমন্ডলে, যা কিছু আছে ভুমন্ডলে, সূর্য, চন্দ্র, তারকারাজি পর্বতরাজি বৃক্ষলতা, জীবজন্তু এবং অনেক মানুষ। আবার অনেকের উপর অবধারিত হয়েছে শাস্তি। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা লাঞ্ছিত করেন, তাকে কেউ সম্মান দিতে পারে না। আল্লাহ যা ইচ্ছা তাই করেন। (সূরা হাজ্জঃ ১৮)

যদিও আল্লাহ তায়া’লা মানুষকে সম্মানিত করেছেন, তবে অধিকাংশ মানুষ লাঞ্ছনার পথই বেছে নেয়। আল্লাহ তায়া’লা বলেনঃ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা লাঞ্ছিত করেন, তাকে কেউ সম্মান দিতে পারে না। (সূরা হাজ্জঃ ১৮)

তারা বেছে নিয়েছে, তারা এ দৃষ্টিতে দেখবে যে,মানুষ অন্যান্য প্রাণীর মতই জীব জানোয়ার, অবোধ যন্ত্র বা সম্পদ অর্জনের মাধ্যম বা অন্য কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে, যা আল্লাহ তায়া’লা কর্তৃক মানুষকে যে সম্মান ও মর্যাদা দেয়া হয়েছে তার বিপরীত।

মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব হলো মানুষ হিসেবেই। ইসলাম নারী পুরুষের মাঝে কোন বিরোধ সৃষ্টি করেনি। অতএব, পুরুষ নারীর বিরুদ্ধে নয়, আবার নারীও পুরুষের বিরুদ্ধে নয়। বরং সমস্ত মানুষ এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়া’লা বলেনঃ হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গীনীকে সৃষ্টি করেছেন; আর বিস্তার করেছেন তাদের দু’জন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাচঞ্ঝা করে থাক এবং আত্নীয় জ্ঞাতিদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন কর। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন রয়েছেন। (সূরা নিসাঃ ১)

সুতরাং যে সম্মান ও ইজ্জত চায় সে যেন সম্মান ও ইজ্জতের পথে চলে। আল্লাহ তায়া’লা বলেনঃ আসলে সমস্ত ক্ষমতা আল্লাহর। (সূরা ইউনুসঃ ৬৫)