face
   

ইসলামী শরিয়তের বৈশিষ্ট্য

ইসলামী শরিয়তের বৈশিষ্ট্য

ইসলামী শরিয়তের বৈশিষ্ট্য

আল্লাহ প্রদত্ত মূল উৎস

www.aroadtohappiness.com

আনাটোলী আন্ডারবাশ

রাশিয়ান জেনারেল
প্রশান্তির ধর্ম
আমি জীবনে প্রথমবারের মত নিরাপত্তা ও প্রশান্তি অনুভব করেছি। অনুভব করেছি যে আমার জীবনের একটি মূল্য আছে। এ বানীর মর্ম জেনেছি যে, যেই আল্লাহকে তুমি দেখনা তিনি তোমাকে দেখেন তুমি যেখানেই থাক। তিনি তোমার আমল পর্যবেক্ষণ করেন এবং কেয়ামতের দিন তোমার সঠিক প্রতিদান দেওয়ার জন্য সঠিক পাল্লা দিয়ে সেগুলো পরিমাপ করবেন। ।

ইসলামের মূল উৎস হলো মহান স্রষ্টা আল্লাহ পাক প্রদত্ত যিনি মানুষ ও এ মহাবিশ্বকে সৃষ্টি করেছেন। যেহেতু এর মূল উৎস আল্লাহ প্রদত্ত তাই এতে রয়েছে নানা বৈশিষ্ট্য। যেমনঃ আল্লাহ তায়া’লা সৃষ্টিকর্তা, তিনি রিযিকদাতা, তিনিই একমাত্র শরিয়ত প্রবর্তনের অধিকারী। সমস্ত আম্বিয়া কিরামগণ তাদের শরিয়তকে আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করতেন। তাঁর শরিয়ত ছাড়া অন্যদের সব শরিয়ত বাতিল বলে গন্য করতেন। আল্লাহ তায়া’লা সর্বশেষ নবী ও রাসুল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পক্ষ থেকে তার শরিয়ত সম্পর্কে বলেনঃ বলুন, আমি তো কোন নতুন রসূল নই। আমি জানি না, আমার ও তোমাদের সাথে কি ব্যবহার করা হবে। আমি কেবল তারই অনুসরণ করি, যা আমার প্রতি ওহী করা হয়। আমি স্পষ্ট সতর্ক কারী বৈ নই। (সূরা আহক্বাফঃ ৯)

আল্লাহর নিকট রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাহিস সালামের সুউচ্চ সম্মান ও মহান মর্যাদা থাকা সত্বেও তিনি তাঁর নিকট প্রেরিত অহী আল্লাহর শরিয়তের অনুসরণ করতেন। তিনি ইহার আবিষ্কারক ছিলেননা, তিনি ইহার কোন বিধান নিজে তৈরি করেননি, বা কোন বিধানের অমান্যকারীও ছিলেননা। আল্লাহ তায়া’লা যেহেতু মানুষের স্রষ্টা সেহেতু তিনি সৃষ্টজীবের সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত। আল্লাহ তায়া’লা বলেনঃ যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি করে জানবেন না? তিনি সূক্ষ্নজ্ঞানী, সম্যক জ্ঞাত। (সূরা মুলকঃ ১৪)

তিনিই বান্দাহর স্বভাব, ভাল মন্দ সবকিছু সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত। কিসে তাদের উপকার ও কিসে তাদের ক্ষতি হবে তা তিনি সবচেয়ে বেশি জানেন। কোন কিছুর সৃষ্টিকারীই সে জিনিসের সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জানেন। আল্লাহ তায়া’লা বলেনঃ আপনি বলে দিন, তোমরা বেশী জান, না আল্লাহ বেশী জানেন? (সূরা বাকারাঃ ১৪০)

আল্লাহ তায়া’লা যেহেতু শরিয়ত প্রণেতা, সেহেতু তিনি এ শরিয়তে সাধারণ ন্যায্যতা ও সঠিকতা বিধান করেছেন। একজনের অপরাধের কারণে আল্লাহ পাক অন্যের কাছে জবাবদিহি চাইবেন না। এমনিভাবে ইসলামে অপরাধের শাস্তিসমূহ দুনিয়া ও আখেরাতের। কেউ যদি কোন কারণে দুনিয়াতে তার হক না পায় তবে সে আখেরাতে সে হক পাবে। অথবা কেউ যদি কোন অপরাধের শাস্তি দুনিয়াতে ভোগ না করে তবে সে আখেরাতে সে শাস্তি ভোগ করবে।

আখলাকের ধর্ম

একথা সর্বজন স্বীকৃত যে, শুধুমাত্র আইনের দ্বারা উদ্দেশ্য সাধিত হয়না। বরং তা বাস্তবায়নের জন্য মানুষের সন্তুষ্টি ও পরিতুষ্টি লাগে। এমনিভাবে আইন কানুনের সুন্দর গঠন ও বিধি বিধান দ্বারা আশানুরূপ ফলাফল বাস্তবায়িত হয়না যতক্ষণ না যাদের জন্য উহা গঠিত হয়েছে তাদের মাঝে বাস্তবায়ন করা হয়, আর এ বাস্তবায়ন হতে হবে তাদের নিজেদের আন্তরিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে। আর এ নিয়ন্ত্রণ তখনই আসবে যখন উক্ত আইনের সমতার ব্যাপারে বিশ্বাস থাকবে, উহার উপর সন্তুষ্ট থাকবে। শরিয়ত প্রণেতা যে সব বিধি বিধান অবতীর্ণ করেছেন সে সবের ব্যাপারে সন্তুষ্ট থাকবে ও তাঁর উপর থাকবে অগাধ বিশ্বাস। ইসলামী শরিয়ত মানুষের সন্তুষ্টি ও পরিতুষ্টি নিয়ে গঠিত, আল্লাহ তায়া’লা ইসলাম শিক্ষায় এ সবের নির্দেশ দিয়েছেন। এবং ওদেরকে সদুপদেশ দিয়ে এমন কোন কথা বলুন যা তাদের জন্য কল্যাণকর। (সূরা নিসাঃ ৬৩) অতএব, আপনি উপদেশ দিন, আপনি তো কেবল একজন উপদেশদাতা, আপনি তাদের শাসক নন। (সূরা গাশিয়াহঃ ২১-২২)

এজন্যই আল্লাহ তায়া’লা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রেরণের উদ্দেশ্যকে আখলাকের জন্য খাছ করেছেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ “আমি উত্তম চরিত্রকে পূর্ণ করতে প্রেরিত হয়েছি”।

দুনিয়া ও আখেরাতের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন

মানব রচিত আইন ও অন্যান্য শরিয়তের সাথে ইসলামী শরীয়তের একটি বিশেষ পার্থক্য হলো, ইসলামী শরিয়ত ভাল মন্দের প্রতিফল দুনিয়া ও আখেরাতে দিয়ে তাকে। বরং আখেরাতের প্রতিদান দুনিয়ার প্রতিদানের চেয়ে অনেক বিশাল। এজন্যই একজন মুসলমান শরিয়তের বিধি বিধান পালন, সৎকাজের অনুসরণ ও অসৎকাজের থেকে বিরত থাকতে সর্বদা তার অন্তরের মজবুত আগ্রহ অনুভব করে। যদিও সে দুনিয়ার শাস্তি থেকে গোপন করতে পারে কিন্তু সে জানে আল্লাহর চক্ষুকে ফাঁকি দিতে পারবেনা, তাঁর চক্ষু কখনও অসতর্ক হয়না বা ঘুমায়না। মানুষ দুনিয়ার জীবনে যা কিছুই করুক না কেন পরকালে সব কিছুরই প্রতিদান পাবে। আল্লাহ তায়া’লা বলেনঃ সে কি মনে করে যে, তার উপর কেউ ক্ষমতাবান হবে না? (সূরা বালাদঃ ৫)

আল্লাহ তায়া’লা বলেনঃ সে কি মনে করে যে, তাকে কেউ দেখেনি? (সূরা বালাদঃ ৭)

সামাজিক

ইসলামী শরিয়ত কোন এক পক্ষের সুবিধাকে অপর পক্ষের উপর কখনও প্রাধাণ্য দেয়না। একজনের অপরাধের কারণে অন্যকে জবাবদিহি করতে বলেনা। মানব রচিত সমাজে যারা ইসলামের পথ অনুসরণ করেনা তাদের একটি মারাত্মক সমস্যার সমাধান ইসলাম দিয়েছে। আর সে সমস্যাটি হলো ব্যক্তি স্বার্থ ও সমষ্টিক স্বার্থের মাঝে সংঘাত।। যেমন আমরা দেখি কোন কোন সমাজ ব্যবস্থায় ব্যক্তি স্বার্থকে সব কিছুর উর্ধে প্রাপ্রাধাণ্য দিয়েছে। যেমনটি দেখা যায় পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায়। অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সামাজিক স্বার্থকে বেশি প্রাধাণ্য দিয়ে থাকে ফলে ব্যক্তি স্বার্থকে উপেক্ষা করা হয়। ব্যক্তিগত ব্যাপার, স্বাধীনতা ও মালিকানাকে বাজেয়াপ্ত করে। এভাবে ব্যক্তিত্বকে অপমান করা হয়, প্রতিভাকে হ্রাস করা হয়, ফলে ব্যক্তির সক্ষমতা ও যোগ্যতায় মরীচিকা ধরে যায়। কিন্তু সমাজের এ সব অধিকারের মাঝে সমতার ভিত্তিতে ইসলাম শরিয়তের বিধি বিধান প্রতিষ্ঠা করেছে। ইসলাম সমাজের সর্বসাধারণের স্বার্থ গুরুত্ব দিয়ে সংরক্ষণ করে, অন্যদিকে মুসলিম ব্যক্তির ব্যক্তিগত চাহিদাকে উপেক্ষা করেনি। যেমন ইসলামে রাজনৈতিক আঙ্গিনায় আমরা দেখি, শাসক ও নেতার আনুগত্য করা প্রত্যেকের দায়িত্ব ও কর্তব্য। কিন্তু এর জন্য শর্ত হলো উক্ত শাসক বা নেতা শরিয়তের বিধি বিধানের উপর অটল থাকতে হবে, সাধারণ মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে হবে। নতুবা ইসলাম তার থেকে এ অধিকার কেড়ে নেয়। তাই শাসক বা নেতার আনুগত্য হবে সে সব কাজে যাতে আল্লাহ তায়া’লার অবাধ্যতা ও নাফরমানি থাকবেনা।

স্থায়ীত্ব ও নমনীয়তা

ইসলাম স্থায়ী মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত, ইহার মূল উৎস মহাগ্রন্থ আল কোরআনে কোন পরিবর্তন বা পরিবর্ধণ হবেনা। আল কোরআন মহান আল্লাহ তায়া’লার সংরক্ষণে সংরক্ষিত। আল্লাহ তায়া’লা বলেনঃ আমি স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ অবতারণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক। (সূরা হুজরঃ ৯)

এতে মিথ্যার কোন অবকাশ নেই। এতে মিথ্যার প্রভাব নেই, সামনের দিক থেকেও নেই এবং পেছন দিক থেকেও নেই। এটা প্রজ্ঞাময়, প্রশংসিত আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। (সূরা আল মু’মিনঃ আয়াতঃ ৪২)

এমনিভাবে রাসুলের সুন্নতও সুক্ষ্মভাবে ও যত্নের সাথে সংরক্ষিত ও লিখিত হয়েছে। কোরআন ও হাদিসের মধ্যে ইসলামী শরিয়তের প্রায় সব বিধি বিধানই বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও বাস্তবায়ণ পদ্ধতি ব্যতীত শামিল করেছে। মুজতাহিদদেরকে সমস্যা ও অবস্থা বুঝে বাস্তবায়ণ করার জন্য এ সুবিধা দিয়েছে। তবে এ সব বিধি বিধান বাস্তবায়ণে নমনীয়তা ও প্রশস্ততা প্রদান করেছে, কেননা এসব বিধিবিধান বাস্তবায়ণে উদ্দেশ্য সাধিত হওয়াটাই মূখ্য বিষয়, বাস্তবায়ণ পদ্ধতি ও ধরণ যেমনই হোক, যতক্ষণ না ইসলামী শরিয়তের কোন নসের বা ইসলামের কোন মৌলিক নীতির বিরোধী হয়। এজন্যই ইসলামী শরিয়তে সাধারণ উদ্দেশ্যসমূহ (মাকাসিদ শরিয়া) বাস্তবায়ণের ক্ষেত্রে অনেক নমনীয়তা ও নতুনত্বের স্থান রয়েছে। এমনিভাবে ইতিপূর্বে ছিলনা এমন কোন নতুন বিধানের সমাধান পূর্বের কোন মাসয়ালার সাথে কিয়াস করে সমাধান দিতে ইসলামে কোন বাঁধা নেই, কেননা প্রতিনিয়তই নতুন নতুন ঘটনা সংঘটিত হয়ে থাকে।